আংকেল! লাইসেন্স প্লিজ...

আংকেল! লাইসেন্স প্লিজ...
————- রশীদ জামাল

টাস করে একটা শব্দ শুনে চমকে উঠলাম আমি। মনেহল কেউ একজন অন্য কারো গালে শক্ত করে একটা চড় মেরেছে। আশেপাশে কেউ নেই। তাহলে এই শব্দ আসল কোত্থেকে। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, শব্দটি শুধু আমি একাই শুনিনি। আরো অনেকেই শুনেছেন। শ্রোতার সংখ্যা অসংখ্য...

২.
এমন নান্দনিক আন্দোলন বাংলাদেশ এর আগে কখনো দেখে নাই। কল্পনা করতে পারলে না দেখবে। আন্দোলন মানে যে দেশে জ্বালাও এবং পোড়াও, সেদেশের  টিনেজার ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের এমন লজ্জাজনকভাবে গণতান্ত্রের পাঠ শেখাবে; কেউ কি কখনো ভেবেছিল?

৩.
তাদেরকে আবাবিল বললে কি বাড়িয়ে বলা হবে? আবাবিলের ঠোঁটে কংকড় ছিল, এদের ঠোঁটে নেই। তবে আবাবিল পাখিরা যেমন দাম্ভিক আবরাহা বাহিনির দম্ভকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল, ছোট্ট এই ছেলেমেয়েগুলোও তো মন্ত্রীদের, নেতাদের, পুলিশের... আরো অনেকের দম্ভকে হতভাম্ভিকভাবে গুড়িয়ে দিল।

৪.
চড়ের শব্দগুলোর জ্যামিতিক হারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ২- ৪- ৮- ১৬- ৩২- ৬৪...। কেউ কি শব্দটি রেকর্ড করে ইকো-সাউন্ডারে বাজিয়ে চলেছে? তবে কি মূল থাপ্পড় একটাই ছিল? সাউন্ড ডুপলিকেশনের মাধ্যমে অনেকগুলো শুনাচ্ছে?
তাও তো মনে হয় না।
প্রতিটি চড়ের শব্দ স্বতন্ত্র।
তাহলে কে কাকে থাপড়াচ্ছে? অথবা কারা; কাদের...

৫.
মটর সাইকেল চালাচ্ছেন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ। কয়েকটি আবাবিল ঘিরে ধরল তাকে। চমৎকার করে বলল,
-পুলিশ আংকেল! লাইসেন্স প্লিজ!
পুলিশ আংকেলকে পকেট থেকে লাইসেন্স বের করে দেখাতে হল। কিন্তু সমস্যা হল সেটা ডেট এক্সপায়ার। আবাবিলরা ঘিরে রেখেছে তাকে। আংকেল! আইন কি শুধু আমাদের জন্য। আমাদেরকে তো ঠিকই ধরে ফেলেন। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাচ্ছেন, এটা কি ভুল না?
-হ্যাঁ ভুল।
-তাহলে বলুন, আমার ভুল হয়েছে।
-আমার ভুল হয়েছে।
সরে দাঁড়াল তারা। আংকেল মুক্তি পেলেন। তবে যে আংকেলের লাইসেন্স ছিল না, তার সাইকেলের চাবিটি তুলে নিয়ে গেল তারা। জমা দিল ট্রাফিক আংকেলের হাতে।

৬.
ওয়ান ওয়ে রোড, অথচ মন্ত্রী মহোদয়ের গাড়ি ঢুকে পড়েছে উল্টা পথে। সমস্যা ছিল না। বাংলাদেশ তো আর ইউরোপ-আমেরিকা নয় যে, রং পার্কিং এর কারণে রাস্তার ট্রাফিক-পুলিশ প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতেও জরিমানার টিকেট ধরিয়ে দেবে। কিন্তু সমস্যা হয়েগেছে আবাবিলরা। পথ আগলে দাঁড়িয়েছে তারা।
-স্লামালিকুম মন্ত্রী আংকেল! আপনিও? আপনি বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনীতি করেছেন। বাংলাদেশের পতাকা তুলেছেন। সেই আপনি যদি আইন ভঙ্গ করেন... আইন তো সবার জন্য সমান। প্লিজ গো ব্যাক।
-আমি তো তোমাদের সাথে কথা বলার জন্যই আসছিলাম।
-তাই বলে রং রোডে?
-ইয়ে... মানে...
-আংকেল! আপনি নিজেই আইন অমান্য করে এসে অন্যদেরকে আইনের কথা কীভাবে বলবেন?
-আমি তোমাদের কাছেই আসছিলাম।
-তাহলে স্যার ওদিক দিয়ে ঘুরে আসুন। আমরা রোড ক্লিয়ার করে দিচ্ছি।
... স্যার আর ঘুরে আসেননি।

৭.
যোগাযোগ মন্ত্রী বলেছেন, ছাত্রদের আন্দোলন যৌক্তিক। প্রধানমন্ত্রী সব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা আশা করতে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা কোটাবিরোধী আন্দোলনের ঘোষণার মত হবে না। আমার দেশের এই ছোট্ট বাচ্চাগুলো বিভিন্ন অনিয়ম দেখতে দেখতে অনেক ক্ষোভ নিয়ে বড় হচ্ছে। অন্তত এদের সাথে যেনো আমরা ধোঁকাবাজিটা না করি। প্রধামন্ত্রীর আশ্বাস পেয়ে ছাত্ররা ক্লাসে ফিরে যাবে। আমরা চাই না আবার তারা একবুক ঘৃণা নিয়ে রাস্তায় নামুক।

৮.
ছাত্র হত্যার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান দন্ত বিকশিত করে হেসেছিলেন! সেটা যতটা না দৃষ্টিকটু ছিল, তারচে বেশি জঘন্য ছিল তার ক্ষমা চাওয়াটা। ক্যামেরার সামনে হাসতে হাসতে বললেন, আমি আর হাসব না! আশাকরি তার শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। এরপরে অন্তত কোনো মৃত্যু সংবাদ শুনে তাঁর হাসি আসবে না।

৯.
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের আওতায় মালিক-শ্রমিকদের টাইট দেওয়া দরকার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আশ্বা্দেসের পরও শংকা কিন্তু থেকেই যায়। মন্ত্রী শাহজাহান খান মন্ত্রিত্বের প্রটোকল নিয়ে মালিকপক্ষের সাথে যখন মিটিং এ বসেন, অথবা সড়ক পরিবহন আইনের সংশোধনী নিয়ে কোনো আইনি সভার অংশ হন, তখন তাকে শ্যামও রাখতে হয় আবার কুলও রাখতে হয়। এর কারণ, তিনি একই সাথে শ্রমিক সংগঠনেরও নেতা। কীভাবে হবে?

১০.
ছাত্রদের এই আন্দোলন সফল। তবে জয়ী কিন্তু সরকারই হল। সাম্প্রতিক অনেকগুলো বিষয় থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর জন্য এমন কিছু একটা দরকার ছিল। আর সেটা যদি হয় এমন শান্তিপূর্ণ এবং অহিংস, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সোনার খবর আর কে রাখে!

১১.
এখন সময়টা ছিল আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কথা বলার। সেটি কীভাবে অবাধ নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত হবে, সেটা নিয়ে ভাবার। কিন্তু এসব নিয়ে যারা কথা বলবে, তারা না পারছে যুক্তিতে, না পারছে শক্তিতে। ছোট্ট ছাত্রছাত্রীদের এই অহিংস আন্দোলন তাদের জন্যো একটি লেসন হতে পারে। অবশ্য সেই বোধ বেচে আছে, নাকি পুরাই গ্যাছে, কে বলবে।

১২.
তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা কিছু স্লোগান ছিল অসাধারণ!

- রাস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ। রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলিতেছে!

-পুলিশ আংকেল! আমি চা-সিগারেটের টাকার জন্য আমি আমার  টিফিনের টাকা থেকে দিয়ে দেব, তবুও আপনারা এমন গাড়ি রাস্তায় চলতে দিয়েন না।

-স্বার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে,
গাড়ির চাপায় মানুষ মরে মন্ত্রী সাহেব হাসে!

-নয় টাকায় একজিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই।

-মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! ছাত্রদের আপাতত রাস্তা সামলাতে দিন। মন্ত্রী, পুলিশকে স্কুলে পাঠান শিক্ষিত করতে।

-We Don't Want digital Bangladesh. We want SAFE Bangladesh.

১৩.
ঘিয়ের মাঝে কাটা বাছতে নেই। কথা ঠিক। কিন্তু ঘি'তে কাটাই-বা থাকবে কেনো? ছাত্রদের এই চমৎকার আন্দোলনের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠা দু'একটি স্লোগান নিয়ে কথা কিন্তু থেকেই যাবে। আমার ভাইয়ের রক্ত লাল, পুলিশ কার চ্যা... ...ল; তেমনই একটি স্লোগান। অনেক বড় বড় মানুষকেও দেখলাম সেটিকে ফলাও করছেন। ব্যাপারটি আমার ভাল লাগেনি। বাচ্চাগুলো তাদের ভাই হত্যার ক্ষোভে এবং পুলিশি অ্যাকশনে ক্ষেপে গিয়ে এমন একটি স্লোগান নাহয় দিয়েই দিয়েছে। আমরা সেটাকে বাহ বাহ'র পর্যায়ে নিয়ে গেলাম কেনো? আমার বাচ্চাদের মুখে খারাপ শব্দ শুনে আমি যদি খুশি হই, তাহলে এটা কেমন আমি? আর শিক্ষকদের কি উচিত ছিল না প্রথম দিনই তাদেরকে শুধরে দেওয়া। লাগলে আরো সুন্দর, আরো ইফেক্টিভ কোনো স্লোগান লিখে দেওয়া? সরি ফর দ্যাট।

১৪.
এর আগে, জামাত-বিএনপির মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার আগে তারা যখন আন্দোলন করত, তখন রাস্তায় শত শত গাড়ি জ্বলত। টায়ার পুড়ত। বাসে পেট্রল বোমা ছুড়ে মারার কথাও আমরা শুনেছি।

এর আগে আওয়ামীলীগ যখন আন্দোলন করত, তখন জ্বালাও-পোড়াও কাকে বলে, উহা কত প্রকার ও কী কী, সেটা বাংলাদেশের মানুষকে আর নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নাই।

এবার স্কুল লেভেলের ছোট্ট বাচ্চারাও আন্দোলন করল। গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে গলার রগ ছিড়ে ফেলা রাজনৈতিক নেতাদের শিক্ষা দিল, অহিংস গণতান্ত্রিক আন্দোলন কাকে বলে এবং সেটা কীভাবে করতে লাগে।

... শুরুর থাপ্পড়ের উৎসটা কি ক্লিয়ার হল?

No comments

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

Powered by Blogger.