আমীন’ শব্দের প্রয়োগ: একটি সতর্কতা

‘আমীন’ শব্দের প্রয়োগ: একটি সতর্কতা
      ------মুফতী আবদুল্লাহ নাজীব হাফিযাহুল্লাহ

ফেসবুকে অনেককে দেখা যায় যে, ভাল কোনো বাণী পোষ্ট করে কমেন্টে ‘আমীন’ লিখতে বলেন। যেমন, ‘কুরআন চিরন্তন ও শাশ্বত বাণী, নামায বেহেস্তের চাবি’ এ ধরনের ভাল কোনো কথা লিখে উপদেশ দিয়ে থাকেন, “সবাই একবার করে আমীন লিখুন বা একবার আমীন লেখার কি  সময় হবে?” এ বিষয়টি বিভিন্ন বাক্যেই প্রকাশ করা হয়। এ ধরনের পোষ্টের পরিমাণ কম নয়। অনেকেই ছাওয়াবের কাজ মনে করে এ ধরণের পোষ্টের কমেন্টে ‘আমীন’ লিখেন বা অন্যের লিখা আমীনের উপর লাইক দিয়ে থাকেন। এভাবে অনেকেই মনের অজান্তেই খ্রিস্টানদের রীতির অনুসরণ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

আমরা জানি, আমীন (آمين ) একটি দুআ বা দুআ কবুলের আবেদন। হযরত আতা ইবনে আবি রাবাহ রাহ. (১১৪হি.) বলেন,“آمين دعاء” (সহীহ বুখারী, অধ্যায়:- ১১১)। ইমাম ইবনুল আছীর রাহ. (৬০৬হি.) আন-নিহায়া কিতাবে আমীন শব্দের অর্থ এভাবে লিখেছেন,“اللّهم استَجب لي ।” ইমাম ইবনু মানযুর রাহ. (৭১১হি.) লিসানুল আরব অভিধানে লিখেছেন, “وآمين:كلمة تقال في إثر الدعاء।” এ থেকে বোঝা গেল, আমীন একটি দুআ বা দুআ কবুল হওয়ার আবেদনমূলক শব্দ। তাইতো দুআ ও মুনাজাতের শেষে আমীন বলা হয় এ অর্থে যে, হে আল্লাহ আমার দুআ কবুল করুন। হাদীস ও ইসলামী পরিভাষায় এ অর্থটিই প্রসিদ্ধ ও সমাদৃত।

প্রিয় পাঠক! আপনি নিজেই ভেবে দেখুন উল্লিখিত বাণীতো দুআ নয়, বরং একটি সংবাদ বা সত্য কথা, সুতরাং এরপরে আমীন বলা বা লেখা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? মূলত এ সকল পোষ্টের পিছনে দুআ উদ্দেশ্য থাকে না। উদ্দেশ্য থাকে, উল্লিখিত বাণী বা সংবাদের সত্যতা প্রকাশ বা সমর্থন গ্রহণ।  কথাটি সত্য, সঠিক বা ভাল এমন মন্তব্যই আশা করা হয় সাধারণ পাঠক, ফলোয়ার ও ফ্রেন্ডদের থেকে।

সতর্কতার বিষয় হলো, আমীন শব্দের এ ধরনের প্রয়োগ মূলত খ্রিস্টানদের রীতির অন্তর্ভুক্ত। খ্রিস্টানদের স্বীকৃত বাইবেলে আমীন শব্দটি দুআর অর্থে ব্যবহার হলেও সত্য, সঠিক ও ভাল অর্থে ব্যবহার বেশ প্রসিদ্ধ। সাধারণ খ্রিস্টানদের মাঝেও এ অর্থে আমীন শব্দের প্রয়োগ বেশ প্রচলিত ও সমাদৃত।
বাইবেল ইনসাইক্লোপিডিয়ায় আমীন শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “However, it is used to mean `truly' or verily'. (Bible Encyclopedia p. 40  আরও দ্র. কিতাবুল মোকাদ্দস ডিকশনারী পৃ. ৬২) বাইবেলের জুবিলী সংস্করণের শব্দকোষ অংশে উল্লেখ হয়েছে, ‘আমেন : হিব্রু একটা শব্দ সত্য থেকে যার উৎপত্তি। আমেন বলে মানুষ প্রার্থনা বা শপথে নিজ পূর্ণ সম্মতি জানায়, কিংবা কোনো ঘোষণায় নিজ পক্ষসমর্থন ব্যক্ত করে’। (জুবিলী বাইবেল পৃ. ১৭৮০)
এ কারণে খ্রিস্টানরা বাইবেলের কোনো বাণী বা ভার্স শুনলে আমীন বলে নিজে সমর্থন জানায়। ফেসবুকে খ্রিস্টানদের অনেক পেজ রয়েছে। ঐ পেজগুলোতে দেখবেন যে, কোনো একজন হয়ত কোনো ভাল বানী বা বাইবেলের ভার্স উল্লেখ করেছে আর অন্যরা তার কমেন্টে আমীন লিখে যাচ্ছে। মূলত এ শব্দ দ্বারা তারা উল্লিখিত কথাটি সত্য ও সঠিক বলে সম্মতি ও সমর্থন প্রকাশ করছে।

সরলমনা মুসলমানদের মাঝে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে মিশনারিদের চতুরতার অন্যতম দিক হলো, মুসলমানদের পরিভাষার অর্থবিকৃতি। মুসলমানদের  মাঝে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের সহজার্থে তারা ইসলামী পরিভাষার আশ্রয় নিয়ে থাকে। ইসলামী শব্দকে নিজেদের অর্থে ব্যবহার করে। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়। এ ভেবে যে, হয়ত সে ইসলামের কথাই বলছে। অথচ এর অন্তরালে রয়েছে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের ঘৃণ্য অপপ্রয়াস!
আমীন শব্দের ক্ষেত্রেও হয়ত এমনটিই হয়েছে। তারা মুসলমানের মাঝে আমীন শব্দ ব্যবহার করছে বাইবেলের অর্থে। আর সরলমনা মুসলমানগণ অসতর্কতাবশত এতে প্রভাবিত হচ্ছে। এবং নিজেদের লিখার মধ্যে তা প্রয়োগ করছে। যা খুবই দুঃখজনক। সুতরাং আমীন শব্দ ব্যবহারে আমাদের পূর্ণ সতর্ক হতে হবে। ইসলমী আদর্শ অনুসারে দুআর ক্ষেত্রেই শুধু আমীন ব্যবহার করবো। যে কোনো বাণী বা সত্য কথার পিছনে আমীন ব্যবহার পরিহার করবো। আর যদি কোনো কথার সমর্থন জানাতেই হয় তবে অন্য শব্দ প্রয়োগ করেই সমর্থন জানাবো। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক কথা জেনে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন ॥

No comments

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

Powered by Blogger.