শরীকানা কুরবানী কি না জায়েয?
শরীকানা কুরবানী কি না জায়েয?
মাওলানা আবদুল্লাহ নাজীব হাফিযাহুল্লাহ
সম্প্রতি লা-মাযহাবীদের অপপ্রচার ‘শরীকানা কুরবানী শুধু মুসাফিরের জন্য বৈধ; মুকীমের জন্য বৈধ নয়’ শুনে এক দীনী ভাই জানতে চাইলেন, শরীকানা কুরবানী কি আসলেই না-জায়েয, যেমনটি তারা বলছে?
ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে স্বীকৃত বিধান হলো, এক গরুতে দু’ তিনজন থেকে সর্বোচ্চ সাতজন শরীক পর্যন্ত শরীক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। চাই তারা মুকীম হোক বা মুসাফির। এ বিধান সহীহ হাদীসসম্মত। এবং সাতজন শরীক হওয়ার ব্যাপারে ইমামগণ সকলের ঐক্যমত রয়েছে। (দ্র. মুখতাছারু ইখতিলাফিল উলামা ৩/ ২২৩)। নি¤েœ সংক্ষেপে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হলো। সুবোধদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
হযরত জাবের রা. বলেন,
أمرنا رسول الله ‘ أن نشترك فى الإبل والبقر كل سبعة منا فى بدنة.
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৯৯৯,৩২৪৮, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং- ৩৯২৪)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় নিজে একাধিকবার কুরবানী করেছেন। যা অনেক সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কখনো এর বিপরীত আদেশ করেননি। একথাও বলেননি যে, এ বিধান শুধু মুসাফিরের জন্য। এছাড়া কিছু কিছু নির্ভরযোগ্য হাদীসে বিধানটি এত ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে যে সেখানে সফরের শর্ত বিবেচনার কোনো সুযোগই নেই। যেমন, হযরত হাসান বিন আলী রা. বলেন,
أمرنا رسول الله صلى الله عليه و سلم في العيدين أن نلبس أجود ما نجد و أن نتطيب بأجود ما نجد و أن نضحي بأسمن ما نجد البقرة عن سبعة
(মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস নং- ৭৫৬০, হাদীসটি হাসান। হাদীসের রাবী ইসহাক বিন বুজুরজ একজন তাবেঈ। ইবনে হিব্বান রাহ. তাকে ছেকাহ সাব্যস্ত করেছেন। (কিতাবুস সিকাত ৮/১২৪ দায়িরাতুল মাআরিফ, হায়দারাবাদ) আর তাকে মাজহুল বা যয়ীফ বলা গ্রহণযোগ্য নয়। লা-মাযহাবীদের একাধিক ইমাম হাদীসটি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। দ্র. ফাতাওয়ায়ে উলামায়ে হাদীস ১৩/১৫২, ফিকহুস সুন্নাহ ১/৩১৭, দারুল কিতাবিল আরাবী, বৈরুত, আল-বাদরুল মুনীর ৫/৪৫ দারুল হিজরাহ, রিয়াদ)
তদুপরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শিক্ষা গ্রহণকারী সাহাবা কেরামের ব্যাপক আমল ছিলো, সাত জন শরীকানা কুরবানী করা। তাঁরা সফর/ ইকামাতের কোনো শর্তারোপ করেননি। ইমাম ইবরাহীম নাখাঈ, মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান ও রিবঈ রাহ.সহ একাধিক তাবেঈ ইমাম সাহাবায়ে কেরামের এ আমল বর্ণনা করেছেন। এখানে শুধু হযরত শাবী রহ. এর বর্ণনা উল্লেখ করা হলো, তিনি বলেন,
أدركت أصحاب محمد - صلى الله عليه وسلم - وهم متوافرون كانوا يذبحون البقرة والبعير عن سبعة.
(আলমুহাল্লা ৬/৪৭ । এর সনদ সহীহ এবং মূল হাদীসটি মারফূ হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে)
পরবর্তীতে সালাফের আমলও এমনি ছিলো। তাঁরা এ দাবী করেননি যে, ‘হাদয়ী’ আর কুরবানী এক নয় বা মুকীমের শরীকানা কুরবানী জায়েয নেই। বরং সালাফিদের ইমাম ইবনে হাযম রাহ. -যারা মুসাফিরের শর্ত করে তাদের দাবি অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন, وهذا تخصيص لا معنى له ( আল-মুহাল্লা ৬/৪৭)।
সাতজন যেভাবে জায়েয সাতের কমও জায়েয
হাদীস বোঝার একটি উসূল হলো, ‘দালালাতুন নাস’। এ উসূলের ভিত্তিতে উল্লিখিত সহীহ হাদীস থেকেই সাতজনের কম শরীক জায়েয হওয়া প্রমাণিত হয়। কারণ, সাত জন জায়েয থাকলে দু’জন অবশ্যই জায়েয হবে। সাঊদীর সালাফী আলেমগণ এমনটিই বলেছেন। (দ্র. (রংষধসয়ধ.রহভড়/ধৎ/;১১১৩২২) সহীহ বুখারীর হাদীস থেকেও তা প্রমাণিত হয়। ইমাম বুখারী রাহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি কুরবানী সম্পর্কে বলেছেন, فيها جزور أو بقرة أو شاة أو شرك في دم ( সহীহ বুখারী হাদীস নং-১৬৮৮) এ হাদীসে ‘শিরকুন ফী দামিন’ ব্যাপক অর্থে উল্লেখ হয়েছে। সুতরাং সাতজন পর্যন্ত যে কোনো সংখ্যায় শরীক হওয়া সুযোগ আছে।
মূলত কিছু লা-মাযহাবীদের ভুল ফাতওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। তারা কখনো বলছে, ‘মুকীমদের জন্য শরীকানা কুরবানী না জায়েয। আবার কখনো বলছে, শরীক হতে হলে সাত জনই হতে হবে; কম হলে জায়েয হবে না।’ এসকল লা-মাযহাবীদের নিকট সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ কোনো হাদীস নেই। তারা কিয়াসনির্ভর এমনটা প্রচার করছে। ফলে নিজেদের মাঝেই শুরু হয়েছে মতানৈক্য। লা-মাযহাবীদের এক বড় জামাত শরীকানা কুরবানীকে জায়েয মনে করেন এবং তারা এ অনুসারে ফাতওয়াও প্রদান করেন। উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় লা-মাযহাবীদের ফাতওয়া সংকলন ‘ফাতাওয়ায়ে উলামায়ে হাদীস’ ১৩/ ১৫২ এ দলীলসহ জায়েযের ফাতওয়া দেওয়া হয়েছে। মূল ফাতওয়াটি নি¤œরুপ,
سوال گائے میں سات آدمی اور اونٹ میں دس آدمی شریک ہونے کا حکم خاص ہدی میں ثابت ہے یا قربانی بھی ثابت ہے، بینوا توجروا؟ جواب قربانی میں بھی ثابت ہے- (فتاوی علمأ حدیث ؛ باب قربانی ۱۳/۱۵۲ مکتبۂ سعیدیۃ ملتان)
সাঊদী সালাফিদের ফাতওয়া বোর্ড ‘ফাতাওয়াল লাজনাতিত দায়েমা” থেকেও অনুরূপ ফাতওয়া প্রদান করা হয়েছে। (দ্র. ফাতওয়া নং- ২৪১৬) বরং তাদের সংখ্যাগরিষ্ট আলেমদের মত জায়েয হওয়ার পক্ষেই। বড়ই অদ্ভূত যে, যেখানে তারা নিজেরাই এ বিষয়ে একমত হতে পারেনি সেখানে অন্যদেরকে বিভ্রান্ত করছে! তজ্জন্যে কোথায় নিজেদেরই সংকুচিত হয়ে থাকার কথা সেখানে অন্যদের প্রতি তোহমত রটাচ্ছে!! আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা এ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ‘হাদীস অনুসরণ’ শিরোনামে!!!
সর্বপরি আমরা দেখলাম বিধানগুলো সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণিত। আমাদের দেশের মুসলামানগণের আমল সুন্নাহসম্মাত। পক্ষান্তরে যারা না-জায়েয বলেছেন প্রথমত, তাদের কাছে কোনো সহীহ হাদীস নেই। আছে শুধু কিয়াস। দ্বিতীয়ত, তারা নিজেরাই একমত হতে পারেনি। এরপরও এমন স্বীকৃত বিধান নিয়ে অপপ্রচার কেন?!!
লেখক: উস্তাদ, দাওয়া বিভাগ,হাটহাজারী মাদরাসা চট্টগ্রাম।
No comments
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ